সার্বিয়ার বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনের সময়, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের একটি দল ঐতিহাসিক 'সুলতান রায়হানীর পত্রিকা' পুনরুদ্ধার করে দেশের গর্ব বাড়িয়ে তুলেছে। এই পত্রিকাটি ১৯১৯ সালে সার্বিয়ার এক লাইব্রেরিতে হারিয়ে যাওয়ার পর বহু বছর ধরে অমীমাংসিত ছিল। শিক্ষার্থীরা স্থানীয় গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় পুরনো নথি অনুসন্ধান করে শেষমেশ পত্রিকাটি সনাক্ত করে এবং নিরাপদে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই অর্জনটি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের শক্তি প্রমাণ করে।
পত্রিকাটি মূলত ১৯১০ দশকে বাংলা-সার্বিয়ান শিক্ষাবিদদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের অংশ হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তা হারিয়ে যায় বলে ধারণা করা হতো। পূর্বে সার্বিয়ার জাতীয় আর্কাইভে কয়েকটি অনুসন্ধান দল এই নথির সন্ধানে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে পাঠানো দলটি, ডিজিটাল মানচিত্র ও পুরনো ক্যাটালগের তুলনা করে নতুন সূত্র আবিষ্কার করে। এই সূত্রের ভিত্তিতে তারা বুদাপেস্টের পুরনো 'সেন্ট জর্জ' লাইব্রেরির অপ্রকাশিত সংগ্রহে পত্রিকাটি খুঁজে পায়। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা আধুনিক অর্কাইভ সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক টেক্সট বিশ্লেষণ ব্যবহার করে নথির অবস্থান নির্ধারণে সহায়তা পেয়েছে।
পুনরুদ্ধারকৃত পত্রিকাটি বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রধান, শ্রীমতি রেহানা হক, প্রকাশ্যে উপস্থাপন করেন এবং বলেন, 'এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যা দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করবে।' একই সঙ্গে বুদাপেস্টের বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান, প্রফেসর জোয়াকিম ভ্লাদিক, শিক্ষার্থীদের গবেষণার পদ্ধতি ও নিষ্ঠাকে প্রশংসা করে জানান, 'এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বহু ঐতিহাসিক নথি উন্মোচনে সহায়ক হবে।' স্থানীয় নাগরিকদেরও এই ঘটনায় উল্লাস দেখা যায়; তারা সামাজিক মাধ্যমে পত্রিকাটির ছবি শেয়ার করে এবং বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অধিকন্তু, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগকে সমর্থন করে আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদদের একটি প্যানেলও সম্মেলনে প্রশংসা জানায় এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য তহবিলের প্রস্তাব দেয়।
দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয়ে বাংলাদেশ সরকার এখন পত্রিকাটির ডিজিটাল সংরক্ষণ ও প্রকাশের জন্য বিশেষ প্রকল্প চালু করেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি দল গঠন করে পত্রিকাটির মূল কপি সংরক্ষণ, অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে এমন ঐতিহাসিক নথি পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ-সার্বিয়া একাডেমিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে পত্রিকাটির উচ্চ রেজোলিউশনের স্ক্যান তৈরি করে বিশ্বব্যাপী অনলাইন লাইব্রেরিতে আপলোড করা হবে, যাতে গবেষক ও সাধারণ পাঠক উভয়েই সহজে প্রবেশ করতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল ঐতিহ্য সংরক্ষণেই নয়, শিক্ষার্থীদের গবেষণা উদ্যমকে উত্সাহিত করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।