কক্সবাজারের বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ায় দেশব্যাপী উচ্ছ্বাসের স্রোত প্রবাহিত হয়েছে। দূর‑দূরান্ত থেকে বহুজন প্রকল্পটি প্রত্যক্ষ করতে এসেছেন; বাতাসে ঘূর্ণায়মান টারবাইনগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন দর্শকগণ। প্রতিটি টারবাইনের ব্লেডের দৈর্ঘ্য ষাট মিটার, আর খুঁটির উচ্চতা নব্বই মিটার, যা আকাশছোঁয়া গঠনকে চমকপ্রদ রূপে উপস্থাপন করে। এই বিশাল কাঠামোগুলো শুধুমাত্র সৌন্দর্যই নয়, দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, কারণ এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সম্পূর্ণভাবে কয়লা‑তেল‑ভিত্তিক জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল নয়।
বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে কয়লা ও তেল প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যার ফলে পরিবেশগত ক্ষতি এবং আর্থিক বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভাগকে ২০ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্যে বহু প্রকল্প চালু করেছে, যার মধ্যে কক্সবাজারের এই বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যতম মাইলফলক। প্রকল্পটি ১২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন, যা প্রায় ১.৫ লক্ষ গৃহস্থালিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ, দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী উভয়ই বায়ু শক্তির টেকসই সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক মন্তব্য করেছেন। স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীও এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বায়ু শক্তি উৎপাদনের ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমে যাবে। পরিবেশবিদরা উল্লেখ করেছেন, টারবাইনগুলো সমুদ্রতীরের নিকটবর্তী হওয়ায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলতে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে। তবে কিছু নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, টারবাইনের শব্দ ও ছায়া স্থানীয় জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কিনা তা নিয়ে। এসব উদ্বেগের সমাধানে প্রকল্প পরিচালনা দল ইতিমধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করেছে।
কেন্দ্রের পরিচালনা সংস্থা এখনো বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্তির শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার বায়ু শক্তি প্রকল্পের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন করে ট্যাক্স রেহাই, সহজতর অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। ভবিষ্যতে কক্সবাজারের এই মডেলকে অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশের জ্বালানি মিশ্রণকে আরও বৈচিত্র্যময় এবং টেকসই করবে। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হবে।