১২ আগস্ট জাতীয় উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় রোজান নামের এক দশম শ্রেণীর ছাত্র হঠাৎ শ্বাসকষ্টে ভুগে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরীক্ষার হলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ ছিল এবং পরীক্ষার সময় দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক পরিশ্রমের ফলে রোজানের শিরা চাপ বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসকরা জানান, রোজানের হৃদপিণ্ডে অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা ঘটেছে এবং দ্রুত সি.পি.আর. (সার্জিকাল হস্তক্ষেপ) করা সত্ত্বেও তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। এই দুঃখজনক ঘটনা পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক করে তুলেছে। রোজান ঢাকা শহরের গোপালপুরে অবস্থিত বাণিজ্যিক কলেজের এক ছাত্র ছিলেন, তার পরিবার শিক্ষায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং তিনি সর্বদা শীর্ষে থাকার লক্ষ্য রাখতেন। পরীক্ষার সময় রোজানকে অতিরিক্ত ল্যাব সরঞ্জাম পরিচালনা করতে বলা হয়েছিল, যা শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর ছিল। তার সহপাঠীরা জানান, রোজান পরীক্ষার আগে কোনো অস্বস্তি প্রকাশ করেননি।
এইচএসসি ব্যবহারিক পরীক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে ছাত্রদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃষি বিষয়ের বাস্তবিক দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। সাধারণত পরীক্ষার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলতে এবং পরীক্ষার পরিবেশের তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ ও সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে গত কয়েক বছরে একই ধরনের কয়েকটি ঘটনার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে; ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের একটি কলেজে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ছাত্রের হাইপোথার্মিয়া হয় এবং ২০২১ সালে খুলনায় একটি রসায়ন ল্যাবে অগ্নিকাণ্ডে একাধিক ছাত্র আহত হন। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকে উন্মোচিত করেছে, যা এখন সরকারী ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
রোজানের বাবা, মোহাম্মদ আলী, রোজানের মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যমে কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, “আমার ছেলে জীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল, আর এখন সে আর নেই; এই দুঃখ আমাদের পরিবারকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।” স্কুলের প্রধান শিক্ষক, মিস রেহানা বেগম, জানান যে পরীক্ষার সময় রোজানের কোনো অস্বস্তি লক্ষ করা হয়নি এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বলেন, “আমরা এই দুঃখজনক ঘটনার তদন্ত ত্বরান্বিত করব এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।” সামাজিক মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি শিক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে; বহু অভিভাবক ও শিক্ষার্থী নিরাপদ পরীক্ষার পরিবেশের দাবি জানিয়েছেন।
সরকারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন করে, যার সদস্য হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ, নিরাপত্তা পরিদর্শনকারী ও আইনি পরামর্শদাতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কমিটি রোজানের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে পরীক্ষার সাইটের তাপমাত্রা, সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও চিকিৎসা সেবা প্রদান প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করবে। তদুপরি, মন্ত্রণালয় সকল উচ্চ মাধ্যমিক ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা কিট এবং প্রশিক্ষিত মেডিকেল স্টাফের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব পেশ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নিরাপত্তা অডিট সম্পন্ন করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো রোজানের মৃত্যুর দুঃখকে কমিয়ে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।