বৈশ্বিকভাবে কাপড়ের বর্জ্য আজকের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের একটি হিসেবে চিহ্নিত, আর এই সমস্যার সমাধানে নতুন পথ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয় (বিইউএফটি) এর পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগে শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি জায়ান্ট গ্রুপের টেক্সটাইল কারখানা পরিদর্শন করে একটি বাস্তবিক গবেষণা পরিচালনা করে। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্জ্য কাপড়কে পুনর্ব্যবহার করে নতুন পোশাক উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা মোট ৩২টি সম্পূর্ণ নতুন পোশাক তৈরি করে, যা পুনর্ব্যবহৃত ফ্যাব্রিকের গুণমান ও নকশার সম্ভাবনা প্রমাণ করে। এই অর্জনটি দেশের টেকসই ফ্যাশন শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত।
কাপড়ের বর্জ্য সমস্যার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় এক কোটি টন টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশের অবদান উল্লেখযোগ্য। দেশের দ্রুত বর্ধমান পোশাক শিল্পের ফলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যও অনিয়ন্ত্রিতভাবে জমা হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণ ও সম্পদ নষ্টের প্রধান কারণ। এ পর্যন্ত সরকার ও বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন পুনর্ব্যবহার প্রকল্প চালু করেছে, তবে অধিকাংশই সীমিত স্কেলে কাজ করেছে এবং বাজারে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে বর্জ্যকে মূল্যবান পণ্য হিসেবে রূপান্তর করা যায়।
বিইউএফটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. রেহানা হক বলেন, “এই প্রকল্পটি শিক্ষার্থীদের বাস্তবিক দক্ষতা প্রদান করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের ধারণা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।” শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকল্পের নেতৃত্বে ছিলেন তৃতীয় বর্ষের সুমাইয়া আর সায়েম, যারা কারখানার পুরনো কাপড় সংগ্রহ করে রঙ, কাটিং ও সেলাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন ডিজাইন তৈরি করেছেন। জায়ান্ট গ্রুপের কারখানা ব্যবস্থাপক মি. রাকিবুল ইসলাম উল্লেখ করেন, “বৈশ্বিক বর্জ্য সমস্যার সমাধানে শিল্পের সহযোগিতা অপরিহার্য, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই ধরনের যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।” পরিবেশ সংস্থা ‘গ্রিন বাংলাদেশ’ এর প্রতিনিধি শ্রীমতি নূরজাহান যোগ করেন, “এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে পুনর্ব্যবহারের সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং তরুণ প্রজন্মকে উদ্ভাবনী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করবে।”
সরকারের পরিবেশ ও বন বিভাগ এই ধরনের গবেষণাকে উৎসাহিত করতে নতুন নীতি প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে টেক্সটাইল বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য আর্থিক সহায়তা ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই বছরে দেশের প্রধান টেক্সটাইল পার্কে পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র স্থাপন করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা তহবিল প্রদান করা হবে। এছাড়া, জাতীয় পর্যায়ে ‘টেকসই ফ্যাশন’ শীর্ষক এক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে শিল্প, একাডেমিয়া ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।