ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বর মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুদ তেলের দাম যেখানে উচ্চমাত্রায় স্থিতিশীল রয়েছে, সেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করছে। এই অস্বাভাবিক রপ্তানি বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে, যদিও ক্রেতারা দাম কমে আসতে দেখতে পাচ্ছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে সরবরাহ বাড়লেও দামের নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ক্রুদ তেল এই সরু জলপথে দিয়ে চলাচল করে। যুদ্ধের আশঙ্কায় এই প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ঝুঁকি বেড়ে গেছে, যাতে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর জন্য দেশগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে। সৌদি আরব, ইরাক ও ইউএই-সহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের পাইপলাইন ও বন্দর ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালু রেখেছে। এই বিকল্প পথগুলো সাধারণত কম ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হতো না, কিন্তু বর্তমান সংকটে এগুলোই হয়ে উঠেছে প্রধান রপ্তানি করিডোর। ফলে তেলের প্রবাহ ঝুঁকিপূর্ণ পথে না গিয়ে নিরাপদ পথে চলাচল করলেও লজিস্টিক খরচ বেড়ে গেছে, যা চূড়ান্ত দামে প্রতিফলিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তেল মন্ত্রণালয়গুলো ও আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি বাড়ার পরও দাম না কমার মূল কারণ হলো বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং জি-৭ ও জি-২০ দেশগুলোর ভাণ্ডার পূরণের প্রয়োজনীয়তা। জনজীবনে এর প্রভাব হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ তেলের আমদানিকারক দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত, কারণ আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারে তেলের দামের ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বর্তমানে নিরাপত্তা পদক্ষেপ জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ওপেক প্লাস দেশগুলো তাদের উৎপাদন নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করছে। ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে, যদি সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়, তবে বিকল্প পথগুলোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তেলের দাম উচ্চমাত্রায় থাকতে পারে এবং রপ্তানি পথগুলো নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে।