রংপুরে শিল্পক্ষেত্রের সম্প্রসারণে বর্তমানে দুইটি প্রধান বাধা উন্মোচিত হয়েছে; যথা যথাযথ অর্থায়নের অভাব ও জ্বালানির ঘাটতি। স্থানীয় উৎপাদন ইউনিটগুলো ধারাবাহিকভাবে ঋণ সুরক্ষায় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচকে অপ্রতিরোধ্য স্তরে নিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি শিল্পের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে স্থবির করে তুলেছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত করেছে। বিশেষত ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই দু’টি সমস্যার ফলে উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং বাজারে প্রতিযোগিতা হ্রাসের মুখে পড়েছে।
রংপুরের অর্থনৈতিক ভিত্তি ঐতিহাসিকভাবে কৃষি ও কৃষিনির্ভর শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গত দশকে সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ না হওয়ায় এই উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত গতিতে অগ্রসর হতে পারেনি। অতীতে রংপুরে গৃহস্থালি পণ্য, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিনিয়োগের প্রবাহ দেখা গিয়েছিল, কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর ঋণ নীতি ও জ্বালানির ঘাটতি এই প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে, শিল্পের বৈচিত্র্যকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় শিল্প সমিতির সভাপতি জানান, “ঋণ পেতে দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা এবং উচ্চ সুদের হার আমাদের উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” রংপুর চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিও উল্লেখ করেন, “জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, ফলে পণ্যের দামও বাড়ছে, যা গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।” শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি যোগ করেন, “বেতন না বাড়ে, খরচ বাড়ে, ফলে কর্মীসংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।” অন্যদিকে, রংপুরের এক আর্থিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে বিদেশি ও স্থানীয় উভয়ই বিনিয়োগ হ্রাস পাবে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।” এসব মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, অর্থায়ন ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান না হলে শিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হবে।
সরকারি কর্তৃপক্ষ এই সমস্যার সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। প্রথমত, রংপুরে বিশেষ শিল্প ঋণ স্কিম চালু করে সুদের হার কমিয়ে এবং ঋণ অনুমোদনের সময়সীমা হ্রাস করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে স্থানীয় জ্বালানি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল করার এবং শিল্প ইউনিটগুলোর জন্য বিশেষ জ্বালানি ভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদুপরি, শিল্প উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নতুন শিল্প পার্ক স্থাপন ও বিদ্যমান পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। ভবিষ্যতে এই নীতিগুলো কার্যকর হলে রংপুরের শিল্পক্ষেত্র পুনরুজ্জীবিত হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।